বৃক্ষ তোমার নাম কী…

জানুয়ারি 6, 2016

আমার দুই মাস বয়েসী ছেলের নাম এডেন।

ইয়েমেনের পোর্ট অভ এডেনের অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যে এ নামে রেখেছি তা নয়, নামটি আমার কণ্যাযুগলের ভীষণ পছন্দের। ওরা অবশ্য এডেন বলে না, খাঁটি অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণে ডাকে এইডেন! যাই হোক ডাক নামটি মা এবং বোনদের পছন্দে রাখলেও ভালো নামটির ক্ষেত্রে আমি হয়ে গেলাম আপোষহীন সংগ্রামী। ছেলের ভালো নাম আমি রাখবো আমার বাবার নামে।

আমার বাবার নাম ফজলুল হক। নামটা বেশ পুরোনো। মানুষ হিসেবেও উনি অতি প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো। ওনার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নাই, ইমেইল খায় না মাথায় দেয় সে নিয়েও খুব একটা ধারণা নেই। ইন্টারনেট নামে একটা বস্তুর কথা শুনেছেন তবে সেটা দিয়ে কীভাবে ব্লগ চালায় উনি আজও বুঝে উঠতে পারেন নি। তাই ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নেয়া বাবার নামে আমি যখন ২০১৫ সালে মেলবোর্নে জন্মানো আমার পুত্রের নাম রাখলাম সে নিয়ে রীতিমতো ধুন্ধুমার লেগে গেল।

বিস্ময়করভাবে প্রথম প্রতিবাদটা আসলো আমার মায়ের কাছে থেকে। টেলিফোনে আমাকে অবাক করে  দিয়ে বলেন—“ এইডা একটা কাম করলি, বুড়া দাদার নামে গুড়া নাতির নাম রাখলি!!”

আমি যতটুকু বুঝি নামের কোনো বুড়া-গুড়া নাই, কিন্তু এ জিনিস মা’কে কে বোঝায়?

বাবাকে নিয়ে আমার অনেক গল্প জমে আছে। সব বলতে গেলে বিরাট কলেবরের একটা উপন্যাস হয়ে যেতে বাধ্য। সেদিকে এগোবার মতো মুরদ বা ফুরসত কোনোটাই আমার এই মুহূর্তে নেই। একটানে যতটুকু পারি লিখে রাখি বাবার গল্প।

বৈদেশে দেখেছি বাপপাগল অনেক ছেলে বাবাকে নিয়ে গর্ব করে বলে –“মাই ড্যাড ইজ মাই হিরো”। আমার বাপ আমার কাছে হিরুফিরু কিছু না, উনি আমার সাদাসিধা, আলাভোলা, দিলখোলা, হাসিখুশী, নির্লোভ, আজন্ম সৎ, মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি, মুজিবরের ভক্ত, আগাপাশতলা রাজাকার বিরোধী, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পিণ্ডি চটকানো, বরিশালের অঁজগ্রামের খাঁটি মাটির মানুষ। ওনার নানা সীমাবদ্ধতা, ছোটো-খাটো অনেক দোষ—কিন্তু এই দোষগুলিই অনেক সময়ে কেতাবী সব গুণকেও ছাড়িয়ে যায়।

আমার বাবা ছেলেবেলায় আমাদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর বাইরে শৌখিনতার আব্দারগুলো সেভাবে কখনোই পূরণ করতে পারেননি। ছোট ছোট চার ভাইবোন নিয়ে আমাদের ছিল অভাবের সংসার।মাঝে মাঝে পেছন ফিরে তাকালে নিজের কাছেই পুরোনো দিনগুলিকে পথের পাঁচালির মতো সাদা-কালো সিনেমা বলে মনে হয়। যদিও আজকের এই ধুরন্ধর ধূসর দুনিয়ায় সেই সাদামাটা সাদা-কালো দিনগুলিকে খুব মিস করি।

ছোটবেলায় আমাদের কোনো যান্ত্রিক বা বাহারী খেলনা ছিল না । আক্ষরিক অর্থেই ঘাস-পাতা-ফুল-পশু-পাখি ইত্যাদির সাথে খেলার সম্পর্ক ছিল আমার। ঝুনঝুনি ছাড়াও যে খেলনা আরও বহু প্রকারের আছে সেটা আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করি গ্রাম ছেড়ে আমরা সপরিবারে শহরে হিজরত করার পরে। গ্রামে তখনো বিনিময় বাণিজ্য চালু ছিল, আধা সের চাল দিয়ে একটা ঝুনঝুনি বা এক সের ডালে আধাসের জিলাপী খুব সহজেই মেলানো যেত। দ্রব্যমূল্য এবং ক্রয়ক্ষমতার মধ্যগত জটিল লুকোচুরি খেলাতে আমার হাতেখড়িও আশির দশকের নিরিবিলি ঢাকা শহরে। একবার কী যেন কিনতে বায়তুল মোকারমে গিয়েছিলাম বাবার সাথে। এক ধুরন্ধর খেলনা বিক্রেতা খুব কায়দা করে আমার হাতে ঝাঁ চকচকে একটা লাল বিদেশী গাড়ি ধরিয়ে দিয়েছিল। ঐ সময়ে ফেরীওয়ালারা এই কাজটা খুব করতো। শিশুদের দেখলেই এটাসেটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে নিত। আমার বয়স তখন পাঁচ বা ছয়। জীবনে প্রথম এই যন্ত্রচালিত গাড়ি হাতে আমি যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছিলাম। খেলনাটা হাতে নিয়ে আমার মুখ উদ্ভাসিত হতে দেখেই বিক্রেতা বাবাকে ডেকে বললেন “ স্যার গাড়ি নিছে আপনার ছেলে, দামটা দিয়া দেন”।

দাম কতো শুনে মুহুর্তেই বাবার মুখটা চুপসে গেছিল। ওনার পকেটে ঐ সময়ে তেমন টাকাও ছিল না খুব সম্ভবত। আমার হাত থেকে নিয়ে খেলনাটা দোকানিকে ফিরিয়ে দিয়ে থমথমে মুখে জনারণ্যে মিশে গিয়েছিলেন বাবা। একটা হাতে ধরে ছিলেন আমার হাত। সেদিনের মতো কেনাকাটা শিকেয় তুলে বাসায় ফিরে এসেছিলাম আমরা। ফেরার পথে পুরোটা রাস্তা তিনি একটি কথাও বলেননি। আমার ব্যাপারটা মনে আছে কারণ ঐ সময়টা ঢাকা শহর বসবাসের এতটা অনুপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। রাস্তায় বের হলে বাবা আমার সাথে নানা ধরনের গল্পগুজব করতেন। তার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মানসিকভাবে শক্ত-পোক্ত করে তোলা। তাই পাঁচ-ছয় বছরের ছেলের সাথেও উনি ইতিহাস-রাজনীতি-পারিবারিক নানা জটিলতা—দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি  ইত্যাদি নানা বিষয়ে বেশ সিরিয়াস ভঙ্গীতে আলাপ জুড়ে দিতেন। কিন্তু সেদিন শবযাত্রীদের মতো গম্ভীর মুখে আমরা বাপ-ছেলে ঘরে ফিরে আসি, বেড়ানোর আনন্দতালটি কেটে গিয়েছিল আমাদের অগোচরে।

বাসায় আসলে সব শুনে মা আমাকে খুব করে বোঝালেন যে ফেরিওয়ালারা খুব ফেরেব্বাজ, সুযোগ পেলেই ছোট শিশুদের হাবিজাবি গছিয়ে দিয়ে বাবা-মায়ের পকেট কাটে। এতে টাকা থাকলে বাবার দিতে খুব কষ্ট হয় আর না থাকলে সবার সামনে অপমানিত হতে হয়।

আমি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর কোনোদিন ফেরিওয়ালারা কেউ হাতে কিছু তুলে দিলে ভুলেও সেটা নেব না। খুব সম্ভবত সেই বেল তলায় ন্যাড়া মাথায় আমি আর কখনো যাইনি।

সুযোগ পেলেই বাবার সাথে খেলতাম আমি, একেবারে ন্যাদাবেলায় ঘুমাতামও বাবার বুকে। ভেতর থেকে উৎসারিত গভীর, অবিমিশ্রিত এবং অনিঃশেষ ভালোবাসা আর রক্তের টানে নিজের কাছে নিজেই প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছিলাম যে সন্তান বাৎসল্যে ভরপুর বাবাকে আর কখনো অন্য মানুষের সামনে লজ্জিত বা অপমানিত হতে আমি দেব না।

আমার সে প্রতিজ্ঞা আমি রক্ষা করতে পারিনি। আজীবনই বাবাকে কষ্ট দিয়ে এসেছি, লজ্জিত করে এসেছি—এতটাই যে ক্ষমা চাইবার সাহসও আমার আর নেই।

বাবা অঢেল প্রাচুর্য তো দূরের কথা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য দিতে না পারলেও একেবারে ছেলেবেলা থেকেই আমাদের মাথাটা পরিষ্কার আর শিরদাঁড়াটা একেবারে খাড়া করে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের আমলের কথা সেভাবে মনে নেই, তবে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের শুরুর থেকেই যখন দেশে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানপন্থী জামাতে ইসলামীর অপরাজনীতির কালনাগ গোকূলে বাড়তে শুরু করে, তখন থেকেই খেয়াল করে এসেছি কলাটা-মূলোটার লোভে বা দেশাত্মবোধের অভাবে না ন্যূনতম রাজনৈতিক সচেনতা না থাকার কারণে ফুলের মতো অসংখ্য ছেলে-মেয়ে জামাতি বিষের প্রভাবে টপাটপ ঝরে পড়লো দিগ্বিদিকশুন্য হয়ে। অনেক চেষ্টা করেও আমার মাথা ভাঙতে পারেনি যদিও, জয় বাংলার হেলমেট মাথায় বসানো হয়ে গেছিল তার অনেক আগেই।

উনি গ্যাদা বয়সেই আমাদের বইমেলায় নিয়ে যেতেন, নিতেন একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাতফেরীতে। শহিদ মিনারকে সামনে রেখে আমাদের বাংলাদেশের সত্যিকারের ইতিহাস শোনাতেন। দ্যাশ-রাজনীতি নিয়া আজাইরা বকবক করে ফুলপ্রুফ করে দিয়েছিলেন জয় বাংলার বিরোধী পাকিস্তানের জারজ সন্তানদের কাছ থেকে। এখনকার প্রজন্ম খুব সম্ভবত ভাবতেও পারবে না যে কত ধরনের ক্রুর পদ্ধতিতে বাংলাদেশের হতভাগ্য মানুষগুলোর মন থেকে ১৯৭১ সালের বিভীষিকা মুছে দিয়ে সেখানে পাকি প্রেমের বীজ বপন করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানের জারজ সন্তানেরা।

একটা ছোট উদাহরণ দেই।

১৯৮৯ সালের কথা। আমি তখন ঢাকার খুব নামকরা এক স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি। একদিন আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক ( জনাবের নাম উল্লেখ করতে চাচ্ছি না) হঠাৎ করে পদার্থ বিজ্ঞান পড়াতে পড়াতে অপদার্থের মতো জিজ্ঞেস করে বসলেন—“ আচ্ছা তোদের মধ্যে কার কার বাপ আওয়ামী লীগ করে?”

আমি চারদিকে তাকিয়ে রীতিমতো বিষণ্ণ হয়ে গেলাম। একটা ছেলেও হাত তোলেনি। এমনকি ঘনিষ্ঠ বন্ধু অভিজিত সেও মাথা নীচু করে বসে আছে, অথচ আমি নিশ্চিতভাবেই জানি ওর বাবা আওয়ামীলীগ পছন্দ করেন। অভিজিতের মাথায় গান্ধী টুপি। কিছুদিন আগে হিন্দু ছেলেদের মাথায়ও টুপি দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে স্কুলে। আমি নিজেই আগের সপ্তাহে প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিষয়ে উপস্থিত বক্তৃতা দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বকবক করে অনেক শিক্ষক এবং সহপাঠীদের চক্ষুশূল হয়েছি। ভাবছিলাম আমিও হাত নামিয়েই বসে থাকবো। কিন্তু হঠাৎ করে বাবার সেই আহত মুখটি মনের পর্দায় ভেসে উঠলো–আমার এই কাপুরুষতার কথা জানতে পারলে বাবা নিশ্চিতভাবেই খুব কষ্ট পাবেন।

ষাট জনের ক্লাসে আমার একলা বিরহী হাতের ভীরু অথচ গোঁয়ার উত্তোলন দেখে স্যার মুখে একগাদা বিরক্তি নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন—“বয়স কত তোর বাপের?”।

আমি বাবার সুনির্দিষ্ট বয়স জানতাম না। আন্দাজ করে বললাম পয়তাল্লিশ।

বিজ্ঞান শিক্ষক বিষাক্ত গলায় হিসহিসিয়ে বললেন—“ তাইলে তোর বাপ দেখে নাই হিন্দুরা এই দেশে মুসলমানদের উপরে কত অত্যাচার করছে। সে আওয়ামীলীগ করবো না তো কে করবো?”

বাকি ক্লাসে উনি বিজ্ঞান নিয়ে আর একটা কথাও উচ্চারণ করলেন না । এমনকি ডাইরিতেও সাইন করেননি সেইদিন। ভীষন উত্তেজিত কণ্ঠে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে যাচ্ছিলেন অনেকগুলো কচি মস্তিষ্কের সামনে। কিশোর মনে হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন আর বাংলাদেশ যে শুধু মাত্র মুসলমানের দেশ সে ধারণা প্রতিষ্ঠায় উনি জান লড়িয়ে দিচ্ছিলেন।

আমার বাবা নিজে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে গিয়ে উনি সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসার মতো অবস্থায়ও পৌছে গেছিলেন একটা পর্যায়ে। শিক্ষকের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে উনি কখনোই কার্পণ্য করেননি। হয়তো এসব কারণেই আমার মুখে সব শুনেও উনি আমার বিজ্ঞান শিক্ষকের প্রতি অপমানজনক কিছু বলেননি, হাতের ইশারায় বিষয়টিকে পাত্তা না দেবার ভঙ্গিতে বলেছিলেন—“ কী জানি বাবা আমারতো সেরকমের কিছু মনে পড়ে না। বাবা বা দাদার কাছেও শুনি নাই আমাদের দেশে মুসলমানদের উপরে হিন্দুদের অত্যাচারের কথা। উনি কেন এই কথা বললেন আমি জানি না। এসব কথায় কান দেবারও দরকার নাই”।

বাবার উপদেশ মেনে সাম্প্রদায়িকতার আহবানে আমি নাক-কান-গলা কিছুই দেই নাই। আমার বন্ধুদের মধ্যে হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ-মুসলমান-নিধর্মী কেউ ছিল না, শুধু মানুষের সাথেই আমার বন্ধুত্ব ছিল।

এটা আসলে আশির দশকের বাংলাদেশের খুব পরিচিত একটা দৃশ্য। সে সময়ে রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র বা প্রকাশ্য জনসভায় বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধু এবং সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা মুখে নেয়াও এক ধরনের অপরাধ ছিল। জেনারেল জিয়া আগেই বিসমিল্লাহর সাথে রাজাকার তোষণের চুড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে জামাতে ইসলামীকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে গেছেন।  ক্ষমতার শীর্ষে আরোহনের পথ পরিষ্কার করেছেন সকাল বিকাল সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অংশটিকে শূলে চড়িয়ে। জেনারেল এরশাদও সেই সুন্নত বজায় রাখলেন হাজারে হাজার মুক্তিযোদ্ধা অফিসার-সৈনিকদের হত্যা করে। বহু মুক্তিযোদ্ধা হত্যার কুশীলব মুক্তিযোদ্ধা(!) প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াকেও উনি শহীদ করে দিতে পিছু হটেননি। এসব কিছুর সাথে উপরি হিসেবে আড়ম্বরের সাথে সংবিধানের খৎনা করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযোজন করে দিলেন।

কুচবিহারে জন্ম নেয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আজন্ম শত্রু এই কুশাগ্র সেনাধিপতি খুব ভালো ভাবেই বুঝে গেছিলেন যে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র যে একটি প্রাগৈতিহাসিক অসভ্য ধারণা সেটা বোঝার ক্ষমতা এই দেশের আম-জনতা কেন, তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত মানুষেরও নাই। রাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম হয় না। রাষ্ট্র দেশের সীমানার মধ্যে বসবাস করা প্রতিটি মানুষের অভিভাবক—সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, কোনো রকমের বিভাজন বা ভেদাভেদ ছাড়াই সমস্ত নাগরিকের দেখভাল করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য । ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাস-মানা- না মানায় বিষয়। রাষ্টযন্ত্রের আটপৌরে সংসারে সংবিধানের সামনে পড়লে ধর্মগ্রন্থ তার ফনা নামিয়ে পথ ছেড়ে দেবে এটাই সভ্যতার শর্ত।

যাক কী কথা বলতে গিয়ে ডাল-পালা ছড়িয়ে এতদূরে চলে এলাম সেটা এখন আমার নিজেরই মনে নেই। তবুও কথায় যেহেতু আজ পেয়েছে আমায় তাই কথা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আসলে আর কোনো উপায়ও নেই।

তো আশি এবং নব্বই দশকের সেক্যুলার বাংলাদেশের দাফন-চিতাদাহ-ক্রুশে চড়ানো ইত্যাদি সম্পন্ন করার সর্বাত্মক অপচেষ্টা যে অনেকাংশে সফল হয়েছে সেটা আজকের বাংলাদেশের খাবি খেতে থাকা,পথভোলা, দিশা হারানো প্রজন্মকে দেখলেই বোঝা যায়।

এমনকি আমাদেরও নিস্তার মেলেনি এর বিষনিঃশ্বাস থেকে। বাবার এত চেষ্টার পরেও, আমার সেক্যুলার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী বেহুলার ঘরে নিষ্কাম খেলাধূলার ফুটো দিয়ে পাকিপ্রেমের মনসাদেবী সল্পকালের জন্য হলেও ঢুকে গেছিল। তখন খেলার সাথে রাজনীতি না মেশানোর আপ্তবাক্যে মত্ত গোটা বাংলাদেশ।  ক্রিকেট নিয়ে আমার বাবার কখনোই কোনো আগ্রহ ছিল না। ফুটবল আর কাবাডির বাইরে আর কিছুতে ওনার মন গলতো না। তো বাবার সরাসরি নজরদারী না থাকায় বাল্যকালে আর সবার দেখাদেখি আমিও ক্রিকেটে পাকিস্তান দলকে বিজয়ী দেখতে চাইতাম। পুরো মহল্লায় কেবল মাত্র একটি ভীষণ ক্ষ্যাপাটে ছেলে ছিল যে কি না পাকিস্তান বিরোধী ছিল ক্রিকেটের ময়দানে। সে ছেলেটি আমি ছিলাম না। সে ছিল সবার দৃষ্টিতে রীতিমতো পাগলাটে, যার যুক্তি এবং বক্তব্য আমি বুঝতে পারি নাকের নীচে গোফের রেখা ভালোভাবে স্পষ্ট হবার পরে। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তান এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার সেমি ফাইনালের দিনে আমার প্রিটেস্ট পরীক্ষা চলছিল। সমস্ত ক্লাসকে সেদিন খেলার ফলাফল নিয়ে উত্তেজনায় কাঁপতে দেখে পরীক্ষার মধ্যে মাইকে ঘোষনা দেয়া হলো ইনজামামের বীরত্বে পাকিস্তানের বিজয়ী হবার খবর। সেটা শুনে সারা স্কুল আনন্দে নেচে উঠেছিল।

এখন লজ্জায় মাথা কাটা গেলেও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে ঐ গাঁড়লদের মধ্যে আমিও ছিলাম। যদিও আমার এই ঘোর ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগেনি। একটা পাষণ্ড জাতি আমার দেশের তিরিশ লাখ মানুষকে পোকা-মাকড়ের মতো পিষে মারলো, অত্যাচারের পরিধি ছাড়িয়ে গেল সভ্য দুনিয়ার আর যে কোনো যুদ্ধকে আর তার কোনো বিচার হলো না। ঐ বর্বর জাতির সাথে শুধু খেলাধূলা কেন, হাগতে-মুততেও রাজনীতি মেশাতে হবে আর নয়তো মেরুদণ্ড বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাবে না এই হতভাগা অত্যাচারিত জাতির মাঝে।

আগের প্রসংগে ফেরা যাক—জেনারেল জিয়া যদি জামাতকে নিষিদ্ধ পল্লী থেকে লোকালয়ে আশ্রয় দিয়ে থাকেন, জেনারেল এরশাদ যদি ঐসব ধর্মব্যবসায়ীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দিয়ে থাকেন তাহলে সেটারই ধারাবাহিকতায় বেগম জিয়া তার শাসনামলে জামাত-শিবিরকে একেবারে একটানে কোলে তুলে নিলেন।

তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেল। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো ক্ষমতার বলয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে  গেল একাত্তরের পরাজিত হায়েনার দল। ক্ষমতার লোভে বেতালা হয়ে একট পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও আমাদের চেনা ধরণীকে নির্দ্বিধায় দ্বিধা করে গাঁটছড়া বাঁধলেন জামাত-শিবির-খুনী রাজাকারদের সঙ্গে। এই জটিল কূরাজনীতির ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশের আজন্ম শত্রু, মানবতার শত্রু, দেশদ্রোহী, আগাপাশতলা ধর্ম ব্যবসায়ী, পাকিস্তানের সুযোগ্য জারজ জামাত ইসলামী পাকাপাকিভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসন গেঁড়ে নিল।

খুব সম্ভবত ২০০১ সালের কথা। আমি অল্প কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছি। বাবা তখনো রিটায়ারমেন্টে যাননি। একদিন সকালে তাঁর অফিসে যাবার পথে আমিও জুটে গেলাম সাথে। পুরোনো দিনগুলোর মতো বাপ-ছেলে হাবিজাবি সব বিষয়ে খেজুরে আলাপ জুড়ে দিয়ে বিকশায় পাশাপাশি যাচ্ছি। বাবার অফিস ফকিরাপুলে। সাধারণত সকাল বেলায় অফিস যাবার সময়ে ফকিরাপুল মোড়ে নিয়মিত ট্রাফিক জ্যাম লেগে যেত। কিন্তু কোনো এক কারণে সেদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে যেতেই দেখা গেল আজদহা সাপের মতো ট্রাফিক জ্যাম তার কুখ্যাত লেজটি খোলস ছাড়িয়ে লম্বা করেই চলেছে। আর সবার মতো আমরাও গলা উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম কোন দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে রাস্তা সাময়িকভাবে বন্ধ কিনা। জানা গেল রাস্তা আটকানো, তবে সেটা গাড়ী-ঘোড়াজনিত দুর্ঘটনার কারণে না। কোনো এক মন্ত্রী যাবে এই পথ দিয়ে তাই।

কুঁচকানো ভ্রূ নিয়ে হাজার অফিসযাত্রী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ছা-পোষা আম-জনতা তখন রাজপথে কার্যত বন্দী। অনেকটা সময় লোকজনকে আটকে রেখে সাইরেন, ভেঁপুতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে মন্ত্রী মহোদয় জাতীয় পতাকা ওড়ানো সরকারী গাড়িবহর নিয়ে রাজপথ দাপিয়ে ছুটে গেলেন। কোন মন্ত্রী গেলেন আমি দেখে চিনতে পারিনি। রিকশাওয়ালাকে প্রশ্ন করে জানলাম উনি জামাতে ইসলামীর আলি আহসান মুজাহিদ, কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। বাবাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে যাব ভেবে পাশে তাকিয়ে দেখি বাবা নেই, কোন ফাঁকে চুপটি করে নেমে গিয়ে জনারণ্যে মিশে গিয়েছেন কে জানে। হয়তো তাঁর তাড়া ছিল—কিন্তু এভাবে কিছু না বলে চলে যাওয়াতে একটা খটকা আমার মনে বিঁধেই রইলো সারাটি দিন।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বাবাকে চেপে ধরলাম কী কারণে উনি না বলে এভাবে রিকশা থেকে নেমে গিয়েছিলেন তা জানতে। শুরুতে উনি এটাসেটা বলে কাটিয়ে দিতে চাইলেও আমার চাপাচাপিতে একটা পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে জানালেন যে স্বাধীন দেশে রাজাকার মন্ত্রীর জাতীয় পতাকা উড়িয়ে সরকারী গাড়ি ছোটানোর দৃশ্য উনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেননি। যেহেতু নীরব প্রতিবাদের বাইরে তাঁর আর করার কিছু নেই তাই নতমস্তকে উনি রিকশা থেকে নেমে গিয়েছিলেন। বলতে বলতে বাবা অন্যদিকে মুখ ঘোরালেন। পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার তখন তাঁর মুখে।

না আমি পারিনি বাবাকে অপমানিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে। না শৈশবে, না কৈশোরে, না ঘোর যৌবনে। চোখের সামনের শকুনের ভোগে দেশকে যেতে দিয়ে চুপিসারে দেশ ছেড়েছি ভাগ্যান্বেষণে। হায়েনা-জঞ্জাল-পাকি জারজ বিতাড়নের লড়াই দেশে থেকে আমার পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। প্রবাস জীবনে বাংলাদেশের পক্ষে যেখানে যতটুকু সম্ভব করার চেষ্টা করেছি, বলেছি, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় সচেষ্ট থেকেছি। ব্লগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা যুদ্ধাপরাধী বিচারের আন্তর্জালিক আন্দোলনের সাথে সর্বাত্মক সংহতি জানিয়ে প্রকাশ্যে-গোপনে সাধ্যমতো যুক্ত থাকার চেষ্টা করেছি। এটা আজ নীশ্চিতভাবেই দাবী করা যায় যে স্বাধীনতার বেয়াল্লিশ বছর পরে হলেও বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ঝোলানোর পেছনে আন্তর্জালিক আন্দোলনের বেশ বড় একটা ভূমিকা ছিল।

নভেম্বরের বাইশ তারিখ বরাবরই আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ঐ দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন আমার বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে। আরই একই দিনে জন্মেছে আমার ছোট ভাই স্বাধীন বাংলাদেশে। গেল বছরের নভেম্বরের বাইশ তারিখে ছিল আমাদের দেবশিশু এডেনের মাটির পৃথিবীতে এক মাসপূর্তির ঘরোয়া উৎসব। কিন্তু সব ছাপিয়ে গেল আরেকটি দীর্ঘ প্রত্যাশিত সুসংবাদ। সেদিনই ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ঝুলিয়ে দেয়া হয় ১৯৭১ সালে বদর বাহিনীর প্রধান, বুদ্ধিজীবি হত্যার কুশীলব, রাজাকার শিরোমণি আ আ মুজাহিদকে।

টেলিফোনে বাবার মনের অবস্থা জানার চেষ্টা করি। আদিপাপ থেকে দেশকে কলংকমুক্ত করার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবার আনন্দের সাথে শংকাও টের পাই তাঁর কণ্ঠে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি মরণ কামড় দেবেই স্বাধীন বাংলাদেশকে অন্ধকার যুগে ঠেলে দিতে। তবে ধর্মব্যবসায়ী হায়েনার দল যে বাংলাদেশে কখনোই বিজয়ী হবে না সে বিষয়ে সুনিশ্চিত প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।

ফজলুল হকের মতো সৎ, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক বাবারা থাকতে এ দেশ কখনোই ঘোর অন্ধকারে ঝুপ করে তলিয়ে যেতে পারে না।

আমার কৃষক দাদাজান শেরেবাংলার কারিশমায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রের নাম রেখেছিলেন ফজলুল হক। আর আমি আমার জন্মদাতার প্রতি গুণমুগ্ধ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় একমাত্র পুত্রের কাঁধেও সেই মহতী নামের ভার উঠিয়ে দিলাম।

জয় হোক!

Advertisements

এই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি…

ডিসেম্বর 1, 2015

আজ আমার শরীর মোটেও ভালো নেই। সিজনাল সর্দি-কাশি-জ্বরে কাবু অবস্থায় আছি। গোদের উপরে বিষফোঁড়ার মতো তার সাথে যুক্ত হয়েছে হালকা-পাতলা ধরনের কিডনি পাথর। ডাক্তারবাবু বললেন ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই, ঔষধপত্র দিচ্ছি পাথর গলে পানি হয়ে বের হয়ে যাবে। কে জানতো যে সেই ঔষধের পাল্লায় পড়ে ঘন্টায় ঘন্টায় বাথরুমে ছুটতে ছুটতে আমার শোবার ঘর আর হাগনকুঠির মধ্যে একটা পায়ে চলা পথ দৃশ্যমান হয়ে উঠবে ( ট্রেডমার্ক: আনিস ভাই J ) । পাথর আছে না গেছে তা জানা যাবে সামনের শুক্কুরবারে। তদব্ধি এই আমার নিয়তি।

অন্দরমহলে রোগশোকে ছিঁচকাদুঁনে হিসেবে আমার একটা কুখ্যাতি আছে। আমার স্ত্রী বলে ম্যান ফ্লু রোগবালাই হিসেবে কোনো জাতেরই না। তাই বাড়িতে শুয়েবসে দিনটা কাটানোর ধান্ধা বাদ দিয়ে গাড়ি ঠেলে অফিসে আসতে হলো। আমি বাড়িতে থাকলে নাকি তাঁকে বেহুদাই জ্বালাতনে জর্জরিত করি, একরকমের ঠেলেঠুলেই আমাকে বাসা থেকে বের করে দিল।

অফিসের পথে অনেকগুলো ফোন আসলো। মঙ্গলবার আসলেই একটি কর্মব্যস্ত দিন। ঘন্টাখানেকের পথযাত্রায় মোটামুটি সবদিকে চাউর করে দেয়া গেল যে আমার শরীর ভালো নেই, টেনশনবর্ধক কোনো খবরাখবর নিয়ে আমার ধারেকাছে আসা আজকে বিলকুল নাজায়েজ। অফিসে এসেও রিসেপশনিষ্টকে বলে রাখলাম অত্যন্ত জরুরী না হলে ফোন-টোন যাতে আমার দিকে পাঠানো না হয়। সে ও এককাঠি বাড়া হয়ে রুমের বাইরে প্রবেশ নিষেধ জাতীয় একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দিল।

নাক দিয়ে এখনো আগুনের হলকা বেরোচ্ছে, কপালের দু’পাশে চলছে ঢিপ ঢিপ। তবুও আগুনগরম এককাপ কফি বানিয়ে আয়েসী একটা চুমুক দিয়ে কম্প্যুটার খুলে কাজে (!) নেমে গেলাম। হঠাৎ করে কেন জানি হাবিজাবি কিছু একটা লিখতে হাত কামড়াচ্ছে। এক বয়সে খুব জমিয়ে গল্প করতে পারতাম। এখন আর সেই হ্যাডম আগের মতো নাই। তবুও লিখতে বসলে ছাইপাশ কিছু একটা, পাতে দেবার মতো হোক বা না হোক, লেখা হয়ে উঠবেই। মাতৃভাষাটা আমার কাছে তাল তাল নরোম কাদার মতো। দক্ষ বা অদক্ষ যাই হোক, আমার কুমোরের হাত দু’টো দিয়ে আমি ইচ্ছে করলেই নানান রঙের ফুল ফোটাতে পারি, থোর বড়ি খাড়ার মতো করে হলেও দাঁড় করিয়ে দিতে পারি অনেককিছুই অনায়াসে। তবে লিখতে বসার ভেতরের তাগিদটা দিনকে দিন মজে যাচ্ছে। এর কোনো চিকিৎসাও আমার জানা নেই।

এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমি মনের ভুলে ঘুরতে ঘুরতে এক তেপান্তরের মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। কেন আছি বা কোথায় যাব তার কিছুই আমার জানা নেই। কেন লিখতে বসলাম বা কী নিয়ে লিখবো সে বিষয়েও কোনো ধারণা নেই। তবে আপাদমস্তক নার্সিসিস্ট একজন মানুষ হিসেবে ( যা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্রও শরমিন্দা নই) আমার নিজের জীবনাভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতেই আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

ডাকাবুকো ধরনের না হলেও মানুষ হিসেবে আমার মধ্যে টনটনে একটা আত্মসম্মানবোধ আর রগরগে আত্মবিশ্বাস ছোটবেলা থেকেই ছিল। টাকাপয়সার বিচারে একেবারে প্রান্তিক একটা পরিবার থেকে উঠে আসতে যা কিনা খুব ভালোভাবেই আমার কাজে এসেছে। আজ মধ্য বয়সে যখন পেছনের দিকে তাকাই অনেক সময় অস্ফুটে নিজেকে বলি ওয়েল ডান ম্যান, ইউ হ্যাভ ডান ওয়েল। আক্ষরিক অর্থেই হাজারো চড়াই-উতরাই আমাকে পেরোতে হয়েছে। তবে সমস্ত বাহবা নিজেকে দিয়ে দেয়াটা খুবই অন্যায্য হবে। এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুঃব্ধ যাত্রায় আমি নির্লজ্জের মতো অনুপ্রেরণা চেটেপুটে খেয়েছি সমসাময়িক মানুষদের কাছ থেকে। আলো ধার করেছি, উৎসাহ মাথা পেতে নিয়েছি, হার না মানা, হাল না ছাড়া, দমতে না জানা মানুষগুলোর কাছ থেকে।

মানুষ যেহেতু প্রাণী হিসেবে খুবই বিচিত্র প্রকৃতির, অনুপ্রেরণার উৎসও একেকজনের জন্য একেক ধরনের। লম্বা আলাপে যাচ্ছি না। আদ্যন্ত ক্রীড়ানুরাগী হিসেবে আমি আজীবন প্রেরণা ধার করে এসেছি খ্যাতনামা সব ক্রীড়াবিদদের কাছে থেকে। শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যারাডোনার গোল অভ দ্য সেঞ্চুরি দিয়ে। পরবর্তী জীবনে গ্যাঁড়াকলে আটকে গিয়ে কত হাজারবার যে সেই গোলটা দেখেছি তার কোনো ইয়াত্তা নেই। এবং প্রতিবারই সেটা টনিকের মতো কাজ করেছে মাথা ঝাড়া দিয়ে আমাকে উঠে দাঁড়াতে। ২০০৫ সালে চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে এসি মিলানের বিরুদ্ধে ৩ গোলে পিছিয়ে থেকেও লিভারপুলের দুর্দান্ত বিজয় আমার মনোজগতে সূর্য হয়ে আলো বিলিয়েছে অনেক অনেক দুঃসহ দিবস-রজনীতে। ২০১২ সালের এশিয়া কাপে ভারতের ওভারে স্লগ ওভারে মুশফিকের দুর্দান্ত ব্যাটিংও কেতরে থাকা পরিস্থিতি থেকে আমাকে টেনে তুলতে সাহায্য করেছে অসংখ্যবার। অধুনা কালের কথা বলতে গেলে সবার আগে থাকবে ২০১৫ সালে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আমাদের রুবেল হোসেনের সেই বিধ্বংসী ওভারটি। এতটা আনন্দ এবং অনুপ্রেরণা যে কতকাল পাইনি তা খোদাই জানে! এখনো মনের অগোচরে গুনগুনিয়ে উঠে—টেল মি ইউ গট পাওয়ার অ্যান্ড আই সে উউউউ…

যদিও এই খেলাটির রাতে আমি আমেরিকার শিকাগোতে। ভীষণ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আমেরিকার এখানে ওখানে আমি অফিসের কাজে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। সপ্তাহদুয়েক আগেই খুন হয়েছেন প্রিয় অভিজিৎদা। আমি জানতামও না যে উনি বাংলাদেশে। আটলান্টা নেমে তাঁকে ফোন করে চমকে দেব ভাবছিলাম, কিন্তু তার আগে উনিই আমাকে সারাজীবনের জন্য দাগা দিয়ে চলে গেলেন। সত্যি কথা বলতে সে রাতের খেলার সময়টাতেই প্রথমবারের মতো আমি ওঁনাকে কিছুটা ভুলে যেতে পেরেছিলাম।

তারপরে কতো ইতিহাস হয়ে গেল। চোখের সামনে বাপ-চাচা-দাদা-মামা-মা-খালা-ফুপু-ভাই-বোনের রক্তে কেনা স্বাধীন দেশটিতে নেমে এল আমবস্যার ঘনঘটা। আপনারা সবই জানেন তাই বিস্তারিত আলাপে যাচ্ছি না। দেশ থেকে একেকটা দুঃসংবাদ আসে আর গুমরে গুমরে আরও নিজের ভেতরে সেধিঁয়ে যাই। মন খারাপের ইতিহাস আমার জীবনের সাথে অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। খুব বেশি ঠেকে গেলে হাঁটুমুড়ে মাটির ধুকধুকানি শুনতাম। আছি, আমি আছি যতটা কাল না পৃথিবীর প্রাণের স্পন্দন আছে। এ বছর হতাশা আর দুর্ভাবনার সম্মিলিত আক্রমণ পেছন থেকে অতর্কিতে পেড়ে ফেলে ছুঁড়ে দিল বাস্তবতার শক্ত জমিনে।

এতকাল ধরে অনুপ্রেরণাদায়ী কোনো বস্তুতেই আর কাজ হচ্ছিল না। হতাশার পর্বতে মাথা কুটে কুটে গুহা বানিয়ে স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাস করে শুরু করে দিয়েছি এমনই দুরাবস্থা।

পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে দুই লক্ষ মানুষ মারা যায়, জন্মায় প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ। জোয়ার-ভাটা, দিবা-নিশির মতো জন্ম-মৃত্যুও অলংঘনীয় একটা বাস্তবতা। এতাই নিয়তি, আমরা এতে অভ্যস্ত। একান্ত আপনজনের সাথে সম্পর্কিত না হলে পৃথিবীজুড়ে ঘটতে থাকা জন্ম-মৃত্যু আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে খুব একটা প্রভাব ফেলে না। আপনজনের সংজ্ঞাও অনেকক্ষেত্রেই আপেক্ষিক।  এ কারণেই রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই আত্মজ হয়ে ওঠেন সমমনা অনেক মানুষ। আর নয়তো মাত্র একবার নামকাওয়াস্তে দেখা হওয়া আর ফেসবুক, ইমেইল, টেলিফোনে রক্ষা করা সম্পর্কের মানুষ অভিজিৎ রায়ের অকালপ্রয়ানে স্বজন হারানোর মতো কষ্টে, শরবিদ্ধ যন্ত্রণায় আমি দিবানিশি ছটফট করতাম না। সেই যন্ত্রণা ভুলতে না ভুলতেই আবার আঘাত। একের পর এক খুন হতে লাগলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার, অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত চিন্তার পথিকৃত লেখক-ব্লগার-অনলাইন সেনানীরা।

অভিজিত রায়ের হত্যার পর থেকেই আমি প্রকাশক টুটুল ভাইকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমি জানি আরও অনেকেই একই দুর্ভাবনায় ভুগছিলেন। ভয়ে ভয়ে বাংলা পত্রিকা বা ফেসবুকের নিউজফিডে চোখ বোলাতাম। এবার আবার কার পালা কে জানে! যে দুশ্চিন্তায় জেরবার ছিলাম সেটাই ঘটে গেল সেদিন। আক্রান্ত হলেন টুটুল ভাই তার নিজের অফিসে। কিন্তু শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে নৃশংস আততায়ীদের সর্বাত্মক আক্রমণকে মোকাবেলা করে বিজয়ী হয়ে ফিরলেন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং ভাই আহমেদুর রশীদ টুটুল, রণদীপম বসু এবং তারেক রহিম। এতটা সাহসী, প্রাণশক্তিতে ভরপুর আর অপরাজেয় মানুষ আমি আমার জীবনে সামনে থেকে খুব কমই দেখেছি। এবং এই অতি সজ্জন, প্রতিভাবান, আমুণ্ডুনখাগ্র অসাম্প্রদায়িক মানুষগুলো যে আমার বন্ধু এবং তাঁদের সাথে কিছুটা সময় কাটানোর সৌভাগ্য যে আমার হয়েছে তাতে নিজেকে নিয়ে আমি নিজেই ঈর্ষান্বিত। এই যে লেখার শুরুতে আমি সামান্য সর্দিকাশি নিয়ে কতবড় গল্প ফেঁদে বসলাম, আর হায়েনার আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত এই মানুষগুলো সাক্ষাৎ যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন হাসিমুখে, কোনো ধরনের অনুযোগ-অভিযোগ ছাড়াই। সাধারণ মানুষ আর মহামানুষদের মধ্যে পার্থক্য খুব সম্ভবত এ ধরনের পরিস্থিতিতেই বোঝা যায়।

তাঁদের সাথে ছিলাম, আছি এবং থাকবো। বাকিটা জীবনও যে তাঁরা আমার অপার অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। নতুন করে আমাকে আর কখনো রোল মডেল খুঁজতে বেরোতে হবে না।

মানবতার জয় হোক, জয় হোক মুক্তচিন্তা আর মুক্তবুদ্ধির।

পাকিস্তানের পথে…

ডিসেম্বর 1, 2015

ঐতিহ্যগতভাবেই পাকিস্তানিদের সাথে আমার বনে না।

যদিও ওদের সাথে সেভাবে মেশার খুব একটা চেষ্টা যে আমি কোনকালে করেছি সেটা দাবী করাটাও যুক্তিসঙ্গত হবে না। দেশে-বিদেশে পাকিস্তানিদের সাথে আমার আজ পর্যন্ত ঘটিত-দুর্ঘটিত যত স্মৃতি তার কোনোটাকেই সুখস্মৃতির কাতারে ফেলার কোনো উপায় আসলে নেই। অথচ একটা দেশের সতেরো কোটি মানুষের মধ্য থেকে পাতে দেবার মতো দু’একটা মানুষের সন্ধানও যে এই বহুমাত্রিক জীবনযাত্রায় মিলবে না সে বাস্তবতাটা মেনে নেয়াটা আসলেই কঠিন। মানুষের মন বলে কথা— যাচাই-বাছাইয়ের আগেই মানুষকে খরচের খাতায় ফেলে দিতে মন মানতে চায় না সহসা।

বাপ হবার পর থেকে মানুষ চিনতে আমার মেয়েরা খুবই কার্যকরী একটা ফিল্টারের মতো কাজ করে। যাদের ওরা পছন্দ করে, দেখলাম তাদের সাথে মিশতে আমারও খুব একটা কষ্ট হয় না। আমি নিজে থেকেও যাঁরা আমার ছেলেমেয়েদের আন্তরিকভাবে ভালোবাসেন তাঁদেরকে নির্দ্বিধায় আমার অন্দরমহলে স্থান দিয়ে এসেছি। আপাত-ভদ্রতার ভরপুর ভতৃকি ছাড়াই ঐ সমস্ত মানুষজনদের সাথে একটা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। এ পর্যন্ত এই ফিল্টার গলে গোপন এজেন্ডাবিদ্ধ কোনো বিটকেলে পাবলিক বা সারা গা দিয়ে ভুরভুর করে দুরভিসন্ধির গন্ধ বেরোনো কেউ হঠাৎ বেরিয়ে এসে চমকে দেয়নি। শিশুসুলভ সারল্যবেষ্টিত নিরিবিলি এই অভয়ারণ্যে আমি এতদিন বেশ ভালোই ছিলাম।

আমার মেয়েরা বেশ মিশুক। হারেদরে সবার সাথেই মেশে কিন্তু বেকায়দা লোকজন দেখলে নিজে থেকেই দূরে সরে যায়। এই বয়সেই নিজেদের সামলে রাখার অভ্যাস ভালোভাবেই গড়ে নিয়েছে। ওদের মা-খালা-নানী ছাড়া বড়দের মধ্যে কেবল আমাকে দেখলেই ছুটে আসে—বাকীদের কপালে জোটে বড়জোর একটা ভূবনমোহিনী হাসি অথবা দু’একটা নখদন্তহীন লম্ফ-ঝম্প। এ নিয়ে আমার মধ্যে একটা গর্বমিশ্রিত ভালোলাগা বেড়ে উঠছিল।

মেলবোর্নে আমার বাড়ি থেকে আধা মাইলের মতো দূরত্বে একটা শপিং মল। দৈনন্দিন সব কেনাকাটা, বাজার-সদায় ওখান থেকেই করা হয়। মেয়েরাও যায় প্রায়ই আমার সাথে। তো ওদের যেহেতু খুব মিশুক স্বভাব, শপিং মলের সেলস গার্ল থেকে শুরু করে বেকারীর লোকজন বা ফলের দোকানদার সবার সাথেই ওদের বেশ খাতির। মানুষের সাথে মিশতে পারা বিরাট একটা গুণ বলে মনে করি আমি, আর তাই ওদের এই নির্বিষ সামাজিকতাতে আমি আপত্তির কিছু খুঁজে পাইনি। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধলো একদিন বিকেলে যখন আমি দেখলাম আমার মেয়েরা ছুটে গিয়ে শপিং মলের এক সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা লোকের সাথে হাই ফাইভ থেকে শুরু করে নানারকমের শিশুতোষ খুনসুঁটিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

কারণ আমি জানতাম যে লোকটা পাকিস্তানি, একদিন পাশ দিয়ে যাবার সময়ে শুনে ফেলেছিলাম যে সে করাচী থেকে নানাঘাটের জল খেয়ে মেলবোর্নে এসে ঠেকেছে। সত্যি কথা বলতে গেলে জাত-পরিচয়ের কারণেই তাকে আমি রীতিমতো এড়িয়েই চলতাম, আসতে-যেতে লোকটির কুশল জিজ্ঞাসার খুব একটা তোয়াক্কা না করেই। কিন্তু আমার সিলেক্টিভ রেসিজমের ফাঁক গলে কোন সুযোগে আমার মেয়েরা যে ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে উঠেছে সেটা আমি টেরই পাইনি। হয়তো আমার ছাড়া ওদের মায়ের সাথে যখন কেনাকাটা করতে আসে তখনই এই দুর্ঘটনাটা ঘটেছে। বাপ হিসেবে এ আমার এক বিরাট ব্যর্থতা। যাই হোক এতদিন মানুষের সাথে ভদ্র-বিনয়ী ব্যবহার করার সবক দিয়ে এসে আমি যদি হঠাৎ করে ওদের বলতে শুরু করি যে ওমুকের সাথে মেশা মানা, বা ওদের খেলার সাথে রাজনীতি মেশাতে যাই তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে ভেবে আমি ঐ মলে যাওয়াই কমিয়ে দিলাম।

কিন্তু এমনই কপাল আমার, অন্যান্য শপিং সেন্টারেও লোকটার সাথে আমাদের হুটহাট দেখা হয়ে যেত লাগলো, যেহেতু তার কাজ শহরের বিভিন্ন মলে ছড়ানো। আগের মতো ঘনঘন দেখা হয় না এ নিয়ে দেখি আমার মেয়েদু’টি আর করাচীওয়ালা দু’পক্ষ থেকেই নানাবিধ অনুযোগ ভেসে আসতে লাগলো। আমি কপট হাসি হেসে মেয়েদের তাড়া দেই, করাচীওয়ালা থেকে আলখাল্লা ( ইউনিফর্ম) এর পকেট থেকে কিসমিস-আখরোট-পেস্তাবাদাম ( চকলেট-ক্যান্ডি-স্টিকার) বের করে মেয়েদেরকে দেবার অনুমতি প্রার্থনা করে। ওদের ঝলমলে চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে পাষণ্ড বাপের তালিকার নিজের নাম তুলে দেবার মতো সাহস আমার করা হয়ে ওঠে না।

এর মধ্যে চলে এল বিশ্বকাপ ক্রিকেট। ভারতের সাথে সেই কুখ্যাত কোয়ার্টার ফাইনাল মাঠে বসে দেখলাম। আর আইসিসির শাপ-শাপান্ত করতে করতে আমি রীতিমতো আশপাশের সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললাম। এরই মাঝে জরুরী কিছু কিনতে আবার যাওয়া হলো সেই বাজারে। ঢোকার পথেই সেই পাকিস্তানি পাহারাদারকে দেখেও না দেখার ভান করে ব্যস্তসমস্ত ভঙ্গিতে জিনিসপাতি উঠিয়ে রাখছিলাম ট্রলিতে। এর মাঝে খেয়াল করলাম দূরে থেকেই সেই লোকটি হাতের ইশারায় আমাকে কী যেন বলার চেষ্টা করছে।

ভালো করে তাকাতেই বোঝা গেল যে হাত দিয়ে বোঝাচ্ছে যে রোহিত শর্মাকে করা ঐ বলটি নো বল ছিল না, এবং পরিষ্কার আউট যে ব্যাটা ছিল সেটাও সে হাতের মুদ্রায় আর মুখের বিগলিত হাসিতে দেখালো। ভেতরে তখনো ভরা মজলিশে প্রতারিত হবার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, তাই কেনাকাটা শেষ করে যাবার পথে লোকটি যখন আবার সে প্রসঙ্গ তুললো তখন আর না দাঁড়িয়ে পারলাম না। আমার মতোই উত্তেজিত স্বরে সে বলতে লাগলো আইসিসি, শ্রীনিবাসনের জোগসাজশে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নানা কুকীর্তির কথা।

কথার মাঝে সে হঠাৎ করে থেমে গিয়ে খুব সাদাসিধাভাবে জিজ্ঞেস করে—“ আচ্ছা সত্যি করে বলুন তো আপনার স্ত্রী-কন্যা সবাই আমার সাথে হাসিখুশী হয়ে কথা বলে অথচ আপনি আজ পর্যন্ত সালাম বা হাই-হ্যালোর জবাব পর্যন্ত দেন না? অথচ অন্য সব স্টাফের সাথে বেশ কথাটথা বলেন, আমি কী দোষটা করলাম?”

ভাবলাম এটা-সেটা বলে কাটিয়ে দেই। কিন্তু সেদিন মেজাজ সপ্তমে চড়ে ছিল, তাই কোনো ভণিতার ধার না ধেরে ১৯৭১ প্রসঙ্গ টেনে অনলবর্ষী কণ্ঠে পাকিস্তান নামক শয়তানের ভোগে যাওয়া অপগণ্ডটিকে সপাটে ধুয়ে দিতে শুরু করলাম। তিরিশ লাখ নিরাপরাধ মানুষ হত্যা, ৩ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির পরেও আজ পর্যন্ত পাকিস্তান একটা সাধারণ ক্ষমাভিক্ষা পর্যন্ত করেনি—আমার বক্তব্যের এই পর্যায়ে আসতেই আমাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে লোকটা হাত উঠিয়ে আমাকে থামিয়ে দিল।

তারপর আমার অগ্নিশর্মা চোখ আর কুঁচকানো ভ্রূর দিকে তাকিয়ে বললো—“ পাকিস্তানি হারামিপনা নিয়ে তুমি আমাকে সবক দিতে আসছো তাই মনের দুঃখে হাসছি। আমার জন্ম পাকিস্তানে হলেও ঐ ভাগাড়ের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই। তল্পিতল্পা গুটিয়ে আর জান হাত করে আমি আর আমার পরিবার আজ থেকে পাঁচ বছর আগেই। পৃথিবীর বুকে জাহান্নাম বলে কিছু থাকে তাহলে সেটা হলো আজকের পাকিস্তান”।

আমার চোখে আগ্রহ দেখে লোকটি নীচু গলায় বিস্তারিত বলে যেতে লাগলো, যেন অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় আছে তার ভেতরে আটকে থাকা কথাগুলোকে কাউকে জানানোর। লোকটির নাম আব্দুর রহমান। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা বেলুচিস্তানে। একেবারে ছেলেবেলায় সেখানে শিয়া-সুন্নি জাতীয় মারামারি-কাটাকাটির বালাই খুব একটা ছিল না। আফগানিস্তানে তালিবানের উত্থানের সাথে সাথে দাবানলের মতো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পরে সারা পাকিস্তানে। সুন্নি কাঠমোল্লার শিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করে যা কি না পাকিস্তানের মতো অন্ধকার দেশে মৃত্যু-পরোয়ানারই নামান্তর। শুরু হয় ঘরে-বাইরে-হাটে-বাজারে-মসজিদে-মাজারে পাইকারী হারে শিয়া হত্যা। আক্রমণের বীভৎসতা পাশবিকতাকেও ছাড়িয়ে যায়। শিয়া নারী-শিশু-বৃদ্ধরাও রক্ষা পায়নি সুন্নি হায়েনাদের হাত থেকে। আব্দুর রহমান যা যা বলেছিল তার সবটা উল্লেখ করা আমার পক্ষে সম্ভব না, তবে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণ্যহত্যার মতোই ভয়াবহ সেই হত্যাযজ্ঞ।

একটা পর্যায়ে রাতের অন্ধকারে ওদের বসভিটাতেও হামলে পরে ধর্মের নামে খুনোখুনির কুশীলবেরা। একান্নবর্তী পরিবারে সব মিলিয়ে গোটা তিরিশেক আত্মীয়-পরিজন বাস করতো সেই বাড়িতে। এদের মধ্যে সাতজন খুন হয়, মারাত্মক আহত হয় গোটা দশেক, বাকীরা কোনোভাবে পালিয়ে বাঁচে। আব্দুর রহমানের বাবা মারা যায়, সাথে বড় ভাই আর চাচাও। মা আর বোনকে সঙ্গে নিয়ে একবস্ত্রে বেলুচিস্তান ছেড়ে পালিয়ে এসে ওরা আশ্রয় নেয় করাচিতেও। সেখানে একটা ফ্যাক্টরীতে গায়ে খাটার কাজ জুটিয়ে নেয় অর্থিনীতিতে স্নাতক ডিগ্রিধারী আব্দুর রহমান। ওদের পারিবারিক নাম রিজভী যেটা কোনোদিন কাউকে বলেনি। কিন্তু তারপরেও আশেপাশে শুনতে পায় ফিসফাস, রক্তপিপাসু হায়েনার পদধ্বনি।

এর মাঝেই এক মানবাধিকার সংস্থার সাহায্যে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনের আবেদন করে ওরা তিনজন এবং মাস দশেক পরে ওরা ভিসাও পেয়ে যায়। তারপর থেকে শুধু বাথরুমে যাবার সময় হলেই সে পাকিস্তানমুখী হয়—ঠিক এ কথাটা বলেই আব্দুর রহমান হেসে ওঠে।

আমি কি বলবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। নামওয়াস্তে সান্ত্বনা দিয়ে চলে আসি। নিজ পরিবারের সাতজন মানুষ হারিয়েও সে যে জীবনযুদ্ধে হার মানেনি সে কারণে একতা সাধুবাদ তার অবশ্যই প্রাপ্য।

চমৎকার ইংরেজি বলে আব্দুর রহমান। পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা করতে চেয়েছিল সে বেলুচিস্তানে। সংসার পাততে চেয়েছিল পছন্দের একজনের সঙ্গে। জানে না সেই মেয়েটির পরিণতি কী হয়েছে। ইসমাত নামের সেই মেয়েটিও যে শিয়া। কে জানে মেয়েটিকে হয়তো সেবাদাসী বানিয়ে রেখেছে কোনো এক সুন্নী কুপুরুষ।

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি আর দূরত্ব বৃদ্ধিতে আর অশুভবুদ্ধির বিস্তারে আর সভ্যতার বিনাশে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হচ্ছে ধর্মের অপব্যবহার।

পাকিস্তান প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই একটা কাঠখোট্টা দেশ, ববাবরই বর্বর এর জমিন। খাসলতের দোষে দেশটি ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সফলভাবে পশুস্থানে পরিণত হয়েছে। সারা দুনিয়া যায় একদিকে আর পাকিস্তান চলে তার উল্টাপথে। আজকের বাংলাদেশেও ধর্মের নামে রাওয়ালপিণ্ডিতে বৃষ্টি হলে ঢাকাতে মাথায় ছাতা দেয়ার লোকের অভাব নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এটাই। আমার কাছে ভীষণ অবাক লাগে যখন দেখি এতটা অত্যাচারিত হয়েও, লাথি-গুঁতা-বেয়োনেট-বুলেট খেয়েও, বছরের পর বছর গোলামী খেটেও বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ এখনো ধর্মের নামে পাকিস্তান নামক দানব রাষ্ট্রের পদলেহন করে।

ঘুঁনেধরা পাকিস্তানি সমাজের নানা রোগের আলামত আস্তে আস্তে আমাদের দেশেও প্রকট হচ্ছে। নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকতা, অন্য ধর্ম বা মতের মানুষদের মানুষের মর্যাদা না দেয়া, নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের আকাশকুসুম খোয়াবে বিবেকবুদ্ধি সব খুইয়ে বসা—এ সবই আমাদের সমাজে বেশ শক্তভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। আমরা যারা মানবতার জয়গান গাই, মানুষে মানুষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কামনা করি ধর্ম-কর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে—এক বাক্যে বলে আসছি যে সময় আছে এখনো শুধরে নেবার, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে সাম্প্রদায়িকতার কর্কট রোগের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার।

এই অসুরের বীজকে অংকুরেই বিনষ্ট করার দায়িত্ব দেশের প্রতিটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের। শুধু সরকারের উপরে ভরসা করে থাকলে আম-ছালা দুইই যাবার সম্ভাবনা বেশী। প্রয়োজন প্রবল জনমত গড়ে তোলার, অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা সবখানে ছড়িয়ে দেবার, ধর্মীয় মৌলবাদ আর সন্ত্রাসবাদের অপশক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াবার।

আর নয়তো সারা দেশে সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে যেভাবে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস উস্কে দেয়া হচ্ছে তাতে দেশটা নাপাক পশুস্তান হতে খুব বেশি সময় আর লাগবে না।

নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি সেরকম পরিস্থিতিতে –“ আজ বুঝবি না বুঝবি কাইল, পাছা থাবড়াবি আর পারবি গাইল” ধরনের কোরাস গাইতে আমরা কেউ আর আসবো না।

Hello world!

অক্টোবর 12, 2009

Welcome to WordPress.com. This is your first post. Edit or delete it and start blogging!